Forbidden

সিনিয়র আপু · পর্ব ২ · সন্ধ্যার কর্নার

সিনিয়র আপু · পর্ব ২ · সন্ধ্যার কর্নার

সন্ধ্যা সাতটা। একই কর্নার। সানজিদা আপু এসে দাঁড়ালেন—এবং রাফি বুঝল, নিয়ম শুধু কথায় নয়। প্রতিটা নজর, প্রতিটা নীরবতা, প্রতিটা কাছাকাছি আসা এখন থেকেই খেলা।

সন্ধ্যা সাতটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে রাফি লাইব্রেরির দোতলায় উঠেছিল।

কর্নারটা আগের মতোই ফাঁকা। বইয়ের তাকগুলোর মধ্যে একটা নরম অন্ধকার জমে আছে। জানালা দিয়ে বাইরের আলো এসে পড়ছে হালকা হলুদ—যেন কেউ ইচ্ছে করে আলো কমিয়ে রেখেছে। রাফি একটা চেয়ারে বসল। হাতে কোনো বই নেই। নোটও নেই। শুধু অপেক্ষা।

সে জানত আপু আসবেন। তবুও বুকের ভিতরটা একটু একটু করে শক্ত হয়ে উঠছিল।

সাতটা বাজার তিন মিনিট পর পায়ের শব্দ শোনা গেল। হালকা। নিশ্চিত।

সানজিদা আপু কর্নার ঘুরে এলেন।

আজকের পোশাকটা আগের দিনের থেকে আলাদা। গাঢ় মেরুন রঙের সালোয়ার কামিজ। কামিজের হাতা একটু চওড়া, গলাটা আগের মতোই খোলা। চুল খোলা, কাঁধে পড়ে আছে। গলায় কোনো চেইন নেই—শুধু একটা সরু কালো সুতো। তিনি যখন এগিয়ে এলেন, রাফির চোখ সেই সুতোটার দিকে এক সেকেন্ডের জন্য গেল, তারপর আবার চোখে উঠল।

সানজিদা আপু রাফির সামনে এসে দাঁড়ালেন। চেয়ারে বসলেন না। দাঁড়িয়েই রইলেন। দুজনের মধ্যে দূরত্ব মাত্র এক হাতের একটু বেশি।

“এসেছ,” তিনি বললেন। গলাটা নিচু। কোনো প্রশ্ন নেই—শুধু স্বীকৃতি।

রাফি উঠে দাঁড়াল। “জি আপু।”

সানজিদা আপু হাসলেন। সেই হাসিটা আগের দিনের মতোই ছোট, কিন্তু আজ চোখে আরও একটা স্তর যোগ হয়েছে। তিনি রাফির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। নীরবতাটা ভারী হয়ে উঠল। কর্নারের বাতাস যেন দুজনের মধ্যে আটকে গেল।

“বসো,” তিনি শেষ পর্যন্ত বললেন।

রাফি আবার বসল। সানজিদা আপু এবার তার সামনের তাকের ধারে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। এক হাত তাকের উপর, অন্য হাত কোমরে। পজিশনটা এমন যেন তিনি ইচ্ছে করেই নিজেকে একটু উঁচু করে রেখেছেন—রাফির চোখের লেভেলের একটু উপরে।

“নোট আনছো?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

রাফি মাথা নাড়ল। “না।”

“ভালো।” সানজিদা আপু আরেকটু এগিয়ে এলেন। এখন তার হাঁটু প্রায় রাফির হাঁটুর কাছাকাছি। “নোট নিয়ে আসলে আমি ভাবতাম তুমি এখনও বুঝোনি।”

রাফি কিছু বলল না। তার চোখ আপুর চোখে আটকে আছে। আপুও সরাচ্ছেন না।

কিছুক্ষণ এভাবেই গেল। শুধু তাকিয়ে থাকা। কেউ পিছু হটছে না। বাইরে থেকে কেউ এলেও যেন শব্দ পৌঁছাবে না—এমন একটা নীরব বুদবুদ তৈরি হয়ে গেছে দুজনের চারপাশে।

সানজিদা আপু হঠাৎ হাত বাড়িয়ে রাফির শার্টের কলারটা স্পর্শ করলেন। আগের দিনের মতোই হালকা। কিন্তু এবার আঙুলটা একটু বেশিক্ষণ থাকল। কলারের কাপড় সরিয়ে তার গলার হাড়ের কাছাকাছি চামড়ায় আঙুলের ডগা লাগল। রাফির শ্বাস একটু ভারী হয়ে গেল।

“এখনও কাঁপছো,” তিনি ফিসফিস করে বললেন। হাসিটা এখন আরও স্পষ্ট। “আমি তো শুধু দাঁড়িয়ে আছি।”

রাফি গিলে ফেলল। “আপু…”

“কী?” তিনি আঙুল সরিয়ে নিলেন। “বলো।”

রাফি কথা খুঁজে পেল না। সানজিদা আপু তার নীরবতা দেখে আরেকটু কাছে এলেন। এবার তিনি হাঁটু গেড়ে রাফির চেয়ারের সামনে বসলেন—না, পুরোপুরি বসলেন না। এক হাঁটু ভাঁজ করে, অন্য পা সোজা রেখে, এমনভাবে যেন তিনি রাফির চোখের সমান উচ্চতায় এসে গেছেন। দুজনের মুখের দূরত্ব এখন হাতের তিন আঙুলের মতো।

“নিয়ম মনে আছে তো?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। শ্বাসটা রাফির গালে লাগছে।

“জি।”

“বলো তো কী নিয়ম।”

রাফির গলা শুকিয়ে গেছে। “কোনো ইমোশন না। কোনো লাভ না। শুধু… কেমিস্ট্রি।”

সানজিদা আপু হাসলেন। “ভালো করে মনে রেখো।” তিনি আরেকটু এগিয়ে এলেন। এখন তার ঠোঁট রাফির ঠোঁটের এত কাছে যে একটু নড়লেই লাগবে। কিন্তু তিনি লাগালেন না। শুধু থামলেন। চোখ খোলা রেখে তাকিয়ে রইলেন।

রাফির হাত আপনার কোমরের দিকে উঠে গেল—প্রায় ছুঁয়ে ফেলার মতো—তারপর থেমে গেল। সানজিদা আপু সেটা দেখলেন। চোখ না সরিয়েই বললেন, “ছোঁবে?”

রাফি হাত নামিয়ে নিল।

“কেন নামালে?” আপু জিজ্ঞেস করলেন। গলায় হালকা বিদ্রূপ। “ভয়?”

“না।”

“তাহলে?”

রাফি উত্তর দিল না। সানজিদা আপু নিজে থেকেই তার হাত তুলে রাফির হাতের উপর রাখলেন। তারপর ধীরে ধীরে রাফির হাতকে নিজের কোমরের দিকে নিয়ে গেলেন। কামিজের কাপড়ের উপর দিয়ে রাফির তালু এল আপুর কোমরে। গরম। শক্ত। আপু নিজে থেকেই একটু চাপ দিলেন—যেন বলছেন, এখানেই রাখো।

“এখন দেখো,” তিনি ফিসফিস করলেন। “আমি তোমাকে ছুঁতে দিলাম। তুমি কী করবে?”

রাফির আঙুল একটু নড়ল। কামিজের কাপড়ের নিচে আপুর শরীরের গরম অনুভব করা যাচ্ছে। তিনি আরও কাছে এলেন। এবার তার কপাল প্রায় রাফির কপালে লাগার মতো। চোখ বন্ধ করেননি কেউই।

“বলো রাফি,” তিনি আবার বললেন। “কী চাও?”

রাফি এবার গলা খুলে কথা বলল। “আপু… আপনাকে।”

সানজিদা আপু হাসলেন। হাসিটা এবার একটু গভীর। “আমাকে কীভাবে?”

রাফি উত্তর খুঁজছিল। আপু তার মুখের এত কাছে যে কথা বলতে গেলে ঠোঁট ঠোঁটে লেগে যাবে। তিনি ইচ্ছে করেই সেই দূরত্বটা বজায় রাখলেন—না কমিয়ে, না বাড়িয়ে। শুধু অপেক্ষা।

কিছুক্ষণ পর তিনি নিজে থেকেই একটু পিছু হটলেন। রাফির হাত এখনও তার কোমরে। তিনি সেটা সরিয়ে দিলেন না। উল্টে রাফির হাত চেপে ধরে আরেকটু উপরে তুললেন—কোমর থেকে একটু উপরের দিকে, কামিজের কাপড়ের নিচে আঙুল ঢোকার জায়গা পর্যন্ত। কিন্তু ঢোকালেন না। শুধু সীমানাটা দেখিয়ে দিলেন।

“এখানে পর্যন্ত,” তিনি বললেন। “আজকে।”

রাফির চোখ বড় হয়ে গেল একটু। সানজিদা আপু উঠে দাঁড়ালেন। রাফির হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে তাকের দিকে এক পা সরে গেলেন। তারপর পেছন ফিরে রাফির দিকে তাকালেন।

“উঠো।”

রাফি উঠল। সানজিদা আপু তাকে ইশারায় বইয়ের তাকের আড়ালে ডাকলেন। কর্নারের আরও গভীরে—যেখানে আলো আরও কম, যেখানে কেউ হঠাৎ এলেও প্রথমে চোখে পড়বে না।

সেখানে গিয়ে তিনি দেয়ালের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালেন। রাফিকে সামনে ডাকলেন। রাফি এগিয়ে গেল। এখন দুজনের মধ্যে দূরত্ব আরও কম। আপু রাফির শার্টের দুই পাশ ধরে তাকে একটু টেনে নিলেন—একেবারে কাছে। বুকের সাথে বুক প্রায় লাগার মতো।

“শোনো,” তিনি খুব আস্তে বললেন। “আমি খেলতে ভালোবাসি। কিন্তু খেলাটা আমার নিয়মে চলবে। তুমি যদি তাড়াহুড়ো করো, আমি থামিয়ে দেব। বুঝেছ?”

রাফি মাথা নাড়ল।

সানজিদা আপু তার এক হাত রাফির গালে রাখলেন। বুড়ো আঙুল দিয়ে তার নিচের ঠোঁটের কোণটা হালকা স্পর্শ করলেন। “ভালো।”

তারপর তিনি নিজে থেকেই এগিয়ে এলেন। ঠোঁট ঠোঁটে লাগল—কিন্তু চুমু নয়। শুধু স্পর্শ। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিনি সরিয়ে নিলেন। রাফির শ্বাস ভেঙে গেল।

“আবার,” তিনি বললেন।

এবার রাফি নিজে থেকেই এগিয়ে গেল। আপু থামালেন না। ঠোঁট আবার লাগল। এবার একটু বেশিক্ষণ। আপুর ঠোঁট নরম, একটু উষ্ণ। তিনি রাফির নিচের ঠোঁটটা হালকা কামড়ে ধরলেন—একটুও জোরে নয়, শুধু টান। তারপর ছেড়ে দিলেন।

রাফির হাত আপুর কোমরে গেল। এবার আপু সরালেন না। উল্টে একটু কাছে এসে শরীরটা রাফির শরীরের সাথে মিলিয়ে দিলেন। কাপড়ের আড়ালে দুজনের গরম মিশে গেল। আপু রাফির কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলেন, “এখনও নিয়ম মনে আছে?”

“জি আপু।”

“তাহলে দেখাও।”

রাফি তার গলায় মুখ নিল। আপুর গলার হাড়ের কাছে চুমু দিল—হালকা, তারপর আরেকটু নিচে। আপু মাথা একটু পেছনে ফেললেন। গলার রেখাটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাফি আরেকটা চুমু দিল। আপুর হাত তার চুলে গিয়ে মুঠো হল—কিন্তু টানল না। শুধু ধরে রাখল।

কিছুক্ষণ এভাবেই চলল। চুমু গলায়, কানে, চোয়ালের লাইনে। আপু কোনো আওয়াজ করলেন না—শুধু শ্বাসটা একটু একটু করে ভারী হচ্ছে। রাফি যখন তার কানের নিচে মুখ রাখল, আপু হঠাৎ তার চুল মুঠো করে একটু টানলেন।

“থেমে যাও,” তিনি বললেন। গলাটা একটু ভাঙা।

রাফি থামল। সানজিদা আপু তার চোখের দিকে তাকালেন। চোখের মণি বড় হয়ে আছে। ঠোঁট একটু ফোলা। তিনি রাফির বুকের উপর হাত রেখে একটু দূরত্ব তৈরি করলেন।

“যথেষ্ট,” তিনি বললেন। “আজকে এখানেই।”

রাফি কিছু বলতে গেল। আপু আঙুল দিয়ে তার ঠোঁটে ছুঁয়ে থামিয়ে দিলেন।

“কথা বলো না। শুধু শোনো।” তিনি শ্বাস নিয়ে বললেন, “কাল একই সময়। একই জায়গা। যদি আসতে চাও।”

রাফি মাথা নাড়ল।

সানজিদা আপু তার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে এক পা সরে গেলেন। কামিজের ভাঁজ ঠিক করলেন। চুল একটু সরিয়ে কাঁধের পেছনে নিলেন। তারপর রাফির দিকে শেষবার তাকালেন।

“এবং রাফি—”

“জি?”

“আজকে যা হয়েছে, সেটা শুধু শুরু। পরেরবার আমি আরও কাছে যেতে দেব। কিন্তু তুমি যদি একবারও ইমোশনের কথা বলো…” তিনি হাসলেন। হাসিটা এবার একটু ঠান্ডা। “তাহলে খেলা শেষ।”

তিনি কর্নার ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন। কয়েক পা গিয়ে থামলেন। পেছন ফিরে তাকালেন না—শুধু গলাটা একটু উঁচু করে বললেন, “দেরি কোরো না কাল।”

তারপর পায়ের শব্দ দূরে চলে গেল।

রাফি জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। গায়ে এখনও আপুর গরম লেগে আছে। ঠোঁটে সেই হালকা কামড়ের অনুভূতি। কোমরে আপুর হাতের চাপের স্মৃতি।

সে জানত, কাল সে আবার আসবে।

এবং সে জানত, সানজিদা আপুও জানেন।

নিয়ম পরিষ্কার। কোনো ইমোশন না। কোনো লাভ না। শুধু কেমিস্ট্রি।

কিন্তু যেভাবে আপু তাকে ছুঁয়েছিলেন, যেভাবে দূরত্ব রেখেও সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, যেভাবে শেষে বলে গেছেন “পরেরবার আরও কাছে”—সেটা শুধু কেমিস্ট্রির চেয়ে অনেক বেশি টান তৈরি করে রেখে গেছে।

রাফি গভীর শ্বাস নিল। কর্নারের বাতাসে এখনও আপুর পারফিউমের হালকা গন্ধ ভাসছে।

কাল সন্ধ্যা সাতটা।

একই জায়গা।


**পর্ব ২ শেষ**

পরের পর্বে: সানজিদা আপু আরও এক ধাপ এগোবেন। এবং রাফি বুঝবে, “আরও কাছে” মানে ঠিক কী।

**পরবর্তী পর্ব পড়ুন →**